বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
MaasrangaNews

জাতীয়

জ্বালানি অনিশ্চয়তায় চাপে দেশ, দ্রুত পদক্ষেপে সরকারের তৎপরতা

জ্বালানি অনিশ্চয়তায় চাপে দেশ, দ্রুত পদক্ষেপে সরকারের তৎপরতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বাধা এবং তেল-গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ দুটিই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সরকার ইতোমধ্যে জনগণের প্রতি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার, ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার, খোলাবাজারে জ্বালানি বিক্রি রোধে তৎপরতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি। এসব নির্দেশনা শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, বরং দায়িত্বশীল জ্বালানি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলারও ইঙ্গিত দেয়।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ‘আপাতত জ্বালানি সংকট নেই’—এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও সীমিত সরবরাহ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকেই অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় অতিরিক্ত জ্বালানি মজুতের চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই ‘প্যানিক বায়িং’ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে আতঙ্কজনিত চাহিদাই অনেক সময় বেশি সংকট সৃষ্টি করে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জরুরি পর্যালোচনা সভায় স্বীকার করা হয়েছে, সম্ভাব্য উৎসগুলো থেকে নির্ধারিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে, যা কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই সরকারকে একদিকে তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জোর দিতে হবে।

সংকট মোকাবিলায় সরকার বহুমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগও নিয়েছে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্রুনেই, আফ্রিকা ও আমেরিকার মতো বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বহুমুখী উৎস অনুসন্ধান ভবিষ্যতে সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, দেশে উৎপাদিত হওয়ায় পেট্রোল ও অকটেনের বড় ধরনের সংকটের সম্ভাবনা নেই। তবে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকায় বিকল্প উৎসের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে চুক্তির আওতায় জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে কেবল আমদানির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং দেশীয় সম্পদের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তির প্রসারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসের মতো বিকল্প উৎস গ্রামীণ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘সাশ্রয়ী ব্যবহার’ নীতিই সবচেয়ে কার্যকর। সরকার ইতোমধ্যে অপ্রয়োজনীয় যানবাহন ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অনেক দেশ সংকট মোকাবিলায় রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে; বাংলাদেশেও সীমিত আকারে এমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। যদিও এতে কিছু অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে, তবুও সামগ্রিক স্বার্থে এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব পরিস্থিতিও এই সংকটের গভীরতা বোঝায়। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। যদিও পরে কিছুটা কমেছে, তবুও অস্থিরতা রয়ে গেছে। এলএনজির বাজারেও একই চাপ বিরাজ করছে। ভারত শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে, পাকিস্তান জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে স্পষ্ট, জ্বালানি সংকট এখন বৈশ্বিক বাস্তবতা।

বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত বিকল্পের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয় সহজ নয়। তাই নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, সতর্কতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সাশ্রয়ী ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমানো এবং গুজব এড়িয়ে চলা—এই সাধারণ পদক্ষেপগুলোই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারের উদ্যোগ ও জনগণের সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে—এটাই এখন সময়ের দাবি।

আরও

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকসে আমন্ত্রণ মোদির, অপেক্ষায় ভারত

জাতীয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকসে আমন্ত্রণ মোদির, অপেক্ষায় ভারত

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অ...

২০২৬-০৭-৩০ ১৮:৫৭

বিশ্বকাপ সম্প্রচারে খরচ প্রায় শূন্য, গতবারের দুর্নীতি ১৪০ কোটি টাকা: তথ্যমন্ত্রী

জাতীয়

বিশ্বকাপ সম্প্রচারে খরচ প্রায় শূন্য, গতবারের দুর্নীতি ১৪০ কোটি টাকা: তথ্যমন্ত্রী

কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব প্রক্রিয়ায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, সে...

২০২৬-০৭-১৯ ১৭:২০

নির্বাচনের বছরে বিএনপির আয় বেড়েছে, ব্যয় বৃদ্ধি ৩ গুণ

জাতীয়

নির্বাচনের বছরে বিএনপির আয় বেড়েছে, ব্যয় বৃদ্ধি ৩ গুণ

বিএনপির আয় গতবারের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি ব্যয় বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। রোববার (১৯ জুলাই) বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল...

২০২৬-০৭-১৯ ১৭:১৭

হেফাজতকে নিঃশেষের পরিকল্পনা থেকেই শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ : চিফ প্রসিকিউটর

জাতীয়

হেফাজতকে নিঃশেষের পরিকল্পনা থেকেই শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ : চিফ প্রসিকিউটর

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলে মন্তব্য ক...

২০২৬-০৭-১৯ ১৭:১৩

গণমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

জাতীয়

গণমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে স্বাধীন ও দায়িত্ব...

২০২৬-০৭-১৭ ১৬:২৫

ব্রয়লার ১৮৫ টাকা কেজি হলেও ডিমের ডজন ১৩৫ টাকা

জাতীয়

ব্রয়লার ১৮৫ টাকা কেজি হলেও ডিমের ডজন ১৩৫ টাকা

রাজধানীর বাজারে মাংস ও ব্রয়লার মুরগির দাম স্থিতিশীল থাকলেও বেড়েছে ডিমের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনে ১০ টাকা করে বেড়েছে।...

২০২৬-০৭-১৭ ১১:৫৫