ইওয়াইয়ের হিসাবে, ইরান সংঘাতের সমাধান না হলে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথটি ২০২৭ সালের প্রথম কিংবা মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বন্ধ থাকলে চলতি বছর ব্রিটিশ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে; পরের বছর মোট দেশজ উৎপাদন সঙ্কুচিত হতে পারে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহণ করা হয়। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘ বিঘ্ন শুধু জ্বালানির দাম নয়, পরিবহণ, খাদ্য, শিল্পোৎপাদন এবং গৃহস্থালির ব্যয়েও চাপ সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ সরকারও এর আগে বলেছিল, এই পথ বন্ধ থাকলে তেল, পরিশোধিত জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সারের সরবরাহে বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।
তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে ছবিটি এতটা অন্ধকার নয়। ইওয়াইয়ের মূল পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকের শেষে হরমুজ খুলে গেলে ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি হতে পারে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘ অবরোধ এবং দ্রুত পুনরায় খোলার দুই পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধানই এখন ব্রিটিশ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।
ইওয়াইয়ের যুক্তরাজ্যবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ পিটার আর্নল্ড সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছেন, এ বছর প্রত্যাশার তুলনায় ব্রিটিশ অর্থনীতি কিছুটা বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখালেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চলমান অস্থিরতা সেই সহনশীলতাকে এখন পরীক্ষা করবে। তার সতর্কতা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হরমুজ খুললে বড় ধরনের মন্দা এড়ানো সম্ভব; কিন্তু ২০২৭ পর্যন্ত বন্ধ থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং অর্থনীতি সঙ্কুচিত হতে পারে।
আর্নল্ড আরও জানিয়েছেন, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হলে প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্যের ব্যবসায়িক পরিষেবার মতো খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। অন্যদিকে নির্মাণ খাতে প্রকল্পব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং কম উৎপাদনশীলতা বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার আগে ইওয়াই ২০২৬ সালে ব্রিটিশ অর্থনীতির ১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখেছিল। পরে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় সেই পূর্বাভাস কমানো হয়। মে মাসে সংস্থাটি চলতি বছরের জন্য শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছিল; নতুন পূর্বাভাসে তা সামান্য বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে, তবে শর্ত একটাই, হরমুজ শিগগির খুলতে হবে।
মূল্যস্ফীতিও ব্রিটেনের বড় উদ্বেগ। ইওয়াইয়ের আগের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, পাইকারি জ্বালানির দাম বাড়লে বছরের শেষে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচু রাখতে হতে পারে। দীর্ঘতর সংকটের আরও কঠোর পূর্বাভাসে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছনোর আশঙ্কাও উঠে এসেছে।
এই আবহেই জ্বালানি ও খাদ্যের দামে সুযোগসন্ধানী বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি। রবিবার (২ আগস্ট) সানডে টেলিগ্রাফ-এ প্রকাশিত এক কলামে তিনি লিখেছেন, এখনও বড় ধরনের মুনাফাখোরির স্পষ্ট প্রমাণ না মিললেও সরকার বাজারের দিকে কড়া নজর রাখছে। পেট্রোলপাম্প বা দোকানের কাউন্টারে সাধারণ মানুষকে “ঠকতে” দেওয়া হবে না বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, দামের চাপের নেপথ্যে মুনাফাখোরির চেয়ে কর, জ্বালানি ও সরবরাহব্যয় বৃদ্ধিই বড় কারণ।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ দশমিক ৪৯ ডলার হয়, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিতে। সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি ও হরমুজ পুরোপুরি খোলার বিষয়ে দ্রুত সমঝোতার প্রত্যাশায় তিনি পরিকল্পিত সামরিক হামলা বাতিল করেছেন। তবে এই সম্ভাব্য সমঝোতা বাস্তবে কত দ্রুত নৌপথ খুলতে পারবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে, ব্রিটেনের সামনে এখন অর্থনৈতিক হিসাবটি সরল কিন্তু কঠিন–হরমুজ যতদিন বন্ধ, জ্বালানি তত ব্যয়বহুল; জ্বালানি যত ব্যয়বহুল, প্রবৃদ্ধি তত দুর্বল। হাজার মাইল দূরের একটি সরু সমুদ্রপথের ওপর তাই নির্ভর করছে ব্রিটিশ পরিবার, ব্যবসা এবং সরকারের আগামী বছরের অর্থনৈতিক ভাগ্য।