দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি আমদানির ওপর চরম নির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘ন্যাশনাল অফশোর এক্সপ্লোরেশন স্কিম’ বা ‘সামুদ্র মন্থন’ প্রকল্পের আওতায় ৮৪ হাজার ০৮৪ কোটি রুপির একটি বিশাল বাজেট অনুমোদন করেছে।
চলতি অর্থবছর থেকে শুরু করে আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত টানা কয়েক বছর ধরে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা হবে দেশের উপকূলবর্তী গভীর এবং অতি-গভীর সমুদ্র অঞ্চলে হাইড্রোকার্বন বা তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সর্বাত্মক অভিযানে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ভারতের জ্বালানি খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে না পারা।
দেশজুড়ে মূল ভূখণ্ড এবং উপকূলীয় যেসব পুরোনো তেল ও গ্যাসের খনি বর্তমানে চালু রয়েছে, সেগুলোতে প্রাকৃতিক নিয়মেই প্রতি বছর উৎপাদন প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে কমে যাচ্ছে।
এই প্রাকৃতিক ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে না পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থা পুরোপুরি বিদেশি বাজার ও আন্তর্জাতিক আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্যই চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
এই পরিস্থিতির টেকসই সমাধানের জন্য ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় দেশের সমুদ্র সীমানার গভীরে নজর দিয়েছে।
ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বঙ্গীয় অববাহিকা, কৃষ্ণ-গোদাবরী, কাবেরী, মহানদী এবং আন্দামান সাগরের তলদেশে বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি অব্যাবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
তবে এসব স্থান থেকে জ্বালানি উত্তোলন করা অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অবিশ্বাস্য রকমের ব্যয়বহুল।
সমুদ্রের তলদেশ থেকে জ্বালানি অনুসন্ধানের প্রকৃতিটি মূলত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সমুদ্র ব্লকে প্রাথমিক জরিপ শুরু করা থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ৫ থেকে ১০ বছরের দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
সমুদ্রের বহুমাত্রিক গভীরে একটিমাত্র পরীক্ষামূলক কূপ খনন করতেই আন্তর্জাতিক বাজারে খরচ হয় প্রায় ১২৫ মিলিয়ন থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় দেড় হাজার কোটি রুপিরও বেশি।
এর সবচেয়ে বড় বিপজ্জনক দিক হলো, এত বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করে কূপ খনন করার পরও সেখানে পর্যাপ্ত তেল বা গ্যাসের সন্ধান মিলবেই—এমন কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
সম্পূর্ণ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এত বড় আর্থিক ঝুঁকি নিতে অনেক সময় বেসরকারি কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাহস পান না।
বিনিয়োগকারীদের এই দ্বিধা দূর করতে এবং অনুসন্ধান কাজ ত্বরান্বিত করতে ভারত সরকার একটি যৌথ ঝুঁকি-অংশীদারিত্ব বা রিস্ক শেয়ারিং নীতি গ্রহণ করেছে।
অর্থাৎ, অনুসন্ধানে মূলধন বিনিয়োগ করে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে বা লোকসানের মুখে পড়লে সেই আর্থিক ঝুঁকির একটি বড় অংশ সরকার নিজেই বহন করবে, যাতে কোনো কোম্পানি আর্থিক ক্ষতির ভয়ে কাজ বন্ধ না রাখে।
সরকারের অনুমোদিত এই ৮৪ হাজার ৮৪ কোটি রুপির বিশাল পরিকল্পনাটিকে বাস্তবমুখী করতে মূল চারটি নির্দিষ্ট প্রধান খাতে ভাগ করে ব্যবহার করা হবে।
বাজেটের সবচেয়ে বড় ও মূল অংশ রাখা হয়েছে সরাসরি কূপ খনন বা ড্রিলিং কাজের জন্য। এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট ৪৩,২০০ কোটি টাকা, যা দিয়ে গভীর সমুদ্রের অতলে ৬০টি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক পরীক্ষামূলক কূপ খনন করা হবে।
বিনিয়োগে গতি আনতে সরকার ঘোষণা করেছে যে, প্রতিটি যোগ্য কূপ খননের মোট খরচের ৫০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৬৭৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ ভর্তুকি হিসেবে সরাসরি সরকার নিজেই প্রদান করবে।
প্রকল্পের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতটি হলো আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সমুদ্রের তলদেশের সিসমিক ডাটা বা কম্পন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা।
সমুদ্রের নিচে কোন কোন স্থানে তেল বা গ্যাসের ঘনত্ব বেশি তা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে সিসমিক ডাটা সার্ভে ও বিশ্লেষণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৫৩৪ কোটি রুপি।
অনুসন্ধান সফল হলে সমুদ্রের গভীর থেকে তেল ও গ্যাস দ্রুত তুলে এনে লোকালয়ে পৌঁছানো এবং তা বাণিজ্যিকীকরণের জন্য বিশেষ অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়।
সেই সুবিধার্থে সমুদ্রেই কমন অফশোর পরিকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার হাব গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১০ হাজার কোটি রুপি।
এছাড়া বিশাল এই গভীর সমুদ্র অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল যন্ত্রপাতি, স্পেয়ার পার্টস এবং কারিগরি পরিষেবা যাতে দেশের ভেতরেই পাওয়া যায়, সেই লক্ষ্যে স্থানীয় প্রযুক্তি ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে উৎসাহিত করতে 'ওয়েল অ্যান্ড গ্যাস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড সার্ভিসেস জোন' স্থাপনের জন্য আরও ২ হাজার কোটি রুপি রাখা হয়েছে।
ভারতের এই মেগা অফশোর অভিযানে রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি শীর্ষস্থানীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন (ওএনজিসি) এবং অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড (ওআইএল) ইতিমধ্যেই তাদের প্রস্তুতি ও কার্যক্রম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি আগামী সাত বছরের মধ্যে সমুদ্রের গভীরে অন্তত ১৫০টি অনুসন্ধান কুপ খননের বিশদ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে।
এর মাধ্যমে সমুদ্র তলদেশে জমে থাকা আনুমানিক ৫ হাজার ৬০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল সমমানের হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে, অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড ইতিমধ্যেই আন্দামান সমুদ্র সীমান্তে তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধান অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করছে এবং সেখানকার বিজয়পুরম-২ ও বিজয়পুরম-৩ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে।
একই সাথে বিশ্বমানের বড় বড় জ্বালানি সংস্থাকে এই মেগা প্রজেক্টে টেনে আনতে সরকার তাদের ‘ওপেন একরেজ লাইসেন্সিং পলিসি’ বা ওএএলপি-র নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একের পর এক গভীর ও অতি-গভীর সমুদ্রের ব্লক উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।
যদি ভারত সরকারের এই সমুদ্র মন্থন পরিকল্পনা প্রত্যাশানুযায়ী সফল হয়, তবে দেশের জ্বালানি মানচিত্রে এক বিশাল যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে।
সরকারি তথ্য ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বার্ষিক মোট উৎপাদন বর্তমানের ৬২ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেলের সমপরিমাণ (এমএমটিওই) থেকে একলাফে বৃদ্ধি পেয়ে ৮০ মিলিয়ন মেট্রিক টনে গিয়ে পৌঁছাবে। একই সাথে দেশের প্রমাণিত হাইড্রোকার্বন সম্পদের ধারণক্ষমতা ১.৬ বিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ২.২ বিলিয়ন টনে উন্নীত হবে।
আর্থিক দিক বিবেচনা করলে, অভ্যন্তরীণ এই অতিরিক্ত জ্বালানি উৎপাদনের ফলে প্রতি বছর বিদেশি বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস আমদানির পেছনে ভারতের যে বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতো, সেখান থেকে বার্ষিক প্রায় ১ লাখ কোটি রুপির মেগা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ দেশের অভ্যন্তরীণ অন্যান্য উন্নয়ন খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজার বা ভূ-রাজনীতিতে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নিরবচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত থাকবে।